জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি। তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল, বন্যা এবং সংক্রামক রোগের বিস্তার মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে। নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মৃত্যুর সঙ্গে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক ছিল। গবেষকদের হিসাবে, এসব মৃত্যুর প্রায় ৬৮ শতাংশের পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সহযোগিতায় প্রস্তুত ল্যানসেট কাউন্টডাউন অন হেলথ অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ ২০২৬ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের শতাধিক প্রতিষ্ঠানের ১৪৬ জন গবেষকের কাজের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনটিতে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ১০ হাজার, যা গবেষণার আওতাভুক্ত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ৭১ শতাংশের বেশি মৃত্যুর পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল বলে গবেষকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকেরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতা ও ডায়াবেটিসের মতো বিদ্যমান রোগের জটিলতাও বেড়ে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব শুধু তাপপ্রবাহে সীমাবদ্ধ নয়। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা পানির সংকট ও খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত করছে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করছে।
২০২৫ সালে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি স্থলভাগ অন্তত এক মাস চরম খরার পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও বেড়েছে। দাবানলের ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়িয়ে শ্বাসকষ্ট ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বন্যার পর দূষিত পানি ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন থেকে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় মশাবাহিত রোগের বিস্তারের অনুকূল পরিবেশও তৈরি হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর দরিদ্র জনগোষ্ঠী, কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, দিনমজুর এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরের বাসিন্দারা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
যেসব মানুষের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিরাপদ পানীয় জল, পর্যাপ্ত পুষ্টি ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত, তাদের জন্য তীব্র গরম মোকাবিলা করা কঠিন। জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানো মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে তুলনামূলক কম অবদান রাখা জনগোষ্ঠীও অনেক ক্ষেত্রে এর গুরুতর স্বাস্থ্যগত ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, উপকূলীয় লবণাক্ততা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
অতিরিক্ত গরমে বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়ে। নিরাপদ পানির সংকট, বন্যার পর রোগের বিস্তার এবং দুর্যোগের কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়া ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা, শহরে সবুজ জায়গা বৃদ্ধি, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা, দুর্যোগ-সহনশীল স্বাস্থ্যসেবা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা জোরদার করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনটিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জলবায়ু-সহনশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের মতে, কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ালে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমার পাশাপাশি বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্যক্ষতিও কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করলে প্রাণহানি কমানো যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং জাতীয় স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিকল্পনাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
গবেষকদের সতর্কবার্তা হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি কমাতে বৈশ্বিক পদক্ষেপের গতি আরও বাড়াতে হবে। একদিকে তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এখনো বিশ্বজুড়ে বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহের উৎস।
তবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ, দূষণ কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতি বাড়ানোর মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। জলবায়ু নীতিতে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া গেলে তা শুধু ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাবে না, বর্তমানেও বহু মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন:







