প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একটি নৌযানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) চালানো এ হামলায় নৌযানটিতে থাকা পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ। তবে নৌযানটিতে মাদক ছিল কি না, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। এ ঘটনায় সমুদ্রে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বৈধতা নিয়ে আবারও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ড (SOUTHCOM) জানিয়েছে, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের এমন একটি নৌপথে দ্রুতগতির নৌযানটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়, যেটি মাদক পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয় বলে তাদের দাবি।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নৌযানটিকে মাদক পাচারের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত বলে শনাক্ত করা হয়েছিল। অভিযানে পাঁচজন নিহত হন। তবে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয়, নৌযানটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং সেখানে কী পরিমাণ মাদক ছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ। এতে পানিতে একটি ছোট নৌযানকে বিস্ফোরণে ধ্বংস হতে দেখা যায়। তবে ভিডিওটি একাই নৌযানটিতে মাদক থাকার অভিযোগ নিশ্চিত করে না।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে লাতিন আমেরিকার আশপাশের সমুদ্রপথে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারী নৌযান লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে পরিচালিত এসব অভিযানের উদ্দেশ্য হিসেবে মাদক পাচার এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধী নেটওয়ার্ক দমন করার কথা বলেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের দাবি, এসব অভিযান যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ মাদকের প্রবাহ কমানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘নার্কো-টেররিস্ট’ বা মাদক-সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করে আসছে।
তবে এসব অভিযানে নিহত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের পরিচয় ও অপরাধে সম্পৃক্ততার বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ না করায় প্রশ্ন উঠেছে। সামরিক বাহিনীর অভিযোগ এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী সামরিক হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘের কয়েকজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ এসব অভিযানের বৈধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সমালোচকদের বক্তব্য, শুধু মাদক পাচারের সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে প্রাণঘাতী হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হলে তা বিচারবহির্ভূত হত্যার পর্যায়ে পড়তে পারে। তাদের মতে, অপরাধের অভিযোগ থাকলে যথাযথ তদন্ত, আটক এবং বিচারপ্রক্রিয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন এসব অভিযানকে মাদক পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে অভিযানগুলোর আইনগত ভিত্তি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার পদ্ধতি এবং ব্যবহৃত গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত ধারাবাহিক অভিযানে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও পর্যবেক্ষক সংস্থার হিসাবে, এসব অভিযানে নিহতের মোট সংখ্যা নিয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে সর্বশেষ হামলার আগেই প্রাণহানির সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়েছিল।
অভিযানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, সমুদ্রে নৌযান ধ্বংস করলেই মাদক সরবরাহের পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে না। মাদক উৎপাদন, অর্থায়ন, স্থলপথে পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এ ছাড়া সামরিক হামলার মাধ্যমে মাদক পাচার কমেছে কি না, তা নির্ধারণ করতে নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকেরা।
আরও পড়ুন:







