আফগানিস্তানে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও ইরান থেকে লাখ লাখ মানুষের প্রত্যাবর্তনের ফলে কর্মসংস্থান, বাসস্থান, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, ব্যাপক দারিদ্র্য, আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাস এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের ফিরে আসা দেশটির মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে আফগানিস্তানে ৬০ লাখেরও বেশি মানুষ ফিরে এসেছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ইরান ও পাকিস্তান থেকে প্রায় ৬৫ লাখ আফগান নাগরিক দেশে ফিরেছেন। তাঁদের মধ্যে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনকারী এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ফেরত পাঠানো মানুষও রয়েছেন।
আফগানিস্তানে ফিরে আসা মানুষের বড় একটি অংশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবিকা নির্বাহ। দীর্ঘদিন বিদেশে বসবাসের পর দেশে ফিরে অনেকেই আগের কর্মসংস্থান, আয় ও সামাজিক সহায়তার নেটওয়ার্ক হারিয়ে ফেলেছেন। অন্যদিকে, স্থানীয় শ্রমবাজারে পর্যাপ্ত চাকরি না থাকায় নতুন করে কাজ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে আফগানিস্তানের প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণে অক্ষম ছিলেন। একই বছরে দেশে ফিরে আসেন প্রায় ২৯ লাখ আফগান। ফলে খাদ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য মৌলিক সেবার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
ইউএনডিপির তথ্য অনুযায়ী, বেশি মানুষ ফিরে আসা কয়েকটি এলাকায় মাত্র ৩ শতাংশ মানুষের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান রয়েছে; বিপরীতে প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ অনিয়মিত দৈনিক মজুরির কাজের ওপর নির্ভরশীল। এতে আয় অনিশ্চিত থাকছে এবং পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রত্যাবর্তনকারীদের বড় একটি অংশের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কাবুল, হেরাত ও মাজার-ই-শরিফের মতো শহরে আবাসনের চাহিদা বাড়ায় ভাড়াবাড়ির বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের ২০২৬ সালের এপ্রিলের আফগানিস্তানবিষয়ক মানবিক পরিস্থিতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, সীমিত আবাসন সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে বিভিন্ন শহরে বাড়িভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে কাবুলে গড় অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে মাসে প্রায় ১৩ হাজার আফগানি এবং বাড়িভাড়া প্রায় ১৫ হাজার আফগানিতে পৌঁছানোর তথ্য দেওয়া হয়েছে।
আয়হীন বা স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর পক্ষে এই ভাড়া বহন করা কঠিন। ফলে অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদের অস্থায়ী আশ্রয়, অনানুষ্ঠানিক বসতি কিংবা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাবিহীন এলাকায় বসবাসের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
আফগানিস্তানের মানবিক সংকট শুধু কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিপুলসংখ্যক প্রত্যাবর্তনকারীর কারণে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ছে।
ইউএনডিপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে আফগানিস্তানের ৮০ শতাংশের বেশি পরিবার ঋণের মধ্যে ছিল। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পরিবার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে এমন কিছু কৌশল অবলম্বন করছিল, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাত্রাকে আরও অনিরাপদ করে তুলতে পারে।
এর মধ্যে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা ঋণ নিয়ে সংসার চালানোর মতো পদক্ষেপ রয়েছে। প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারগুলোর হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ও সম্পদ না থাকলে এসব ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এদিকে খরা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও নতুন করে ফিরে আসা মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারগুলোর মধ্যে নারী ও শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনেক পরিবার দীর্ঘদিনের বসতি, আয় ও সামাজিক নিরাপত্তা হারিয়ে দেশে ফিরছে। পর্যাপ্ত পরিচয়পত্র না থাকা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং নারীদের কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ তাদের পুনর্বাসনকে আরও কঠিন করে তুলছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিরে আসা আফগানদের মধ্যে নারী ও শিশুর অনুপাত উল্লেখযোগ্য। এসব পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ করে নারী-প্রধান পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং যেসব শিশুর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়েছে, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন।
আফগানিস্তানে প্রত্যাবর্তনকারীদের পুনর্বাসন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে মানবিক চাহিদা বাড়ার সময় অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো ২০২৬ সালের জন্য আফগান প্রত্যাবর্তনকারীদের সহায়তায় একটি পৃথক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। ওই পরিকল্পনায় এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়কালে আরও প্রায় ২৭ লাখ মানুষের ফিরে আসার সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিক জরুরি সহায়তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনাটির জন্য মোট ৫২ কোটি ৯২ লাখ মার্কিন ডলারের অর্থায়ন প্রয়োজন বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সীমান্তে জরুরি সহায়তা বা অস্থায়ী আশ্রয় দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি, সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করা, ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা, কৃষি ও স্থানীয় বাজার পুনরুজ্জীবিত করা এবং মৌলিক সরকারি সেবার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে যেসব এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ফিরে আসছেন, সেখানকার আগে থেকেই সংকটে থাকা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে সীমিত সম্পদ ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে এবং সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
আফগানিস্তানে মানুষের প্রত্যাবর্তন তাই কেবল সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা নয়; এটি আবাসন, জীবিকা, মানবিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের সঙ্গে জড়িত একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রত্যাবর্তনকারীদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে জরুরি ত্রাণের পাশাপাশি টেকসই কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:







