News Ticker
221.png

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:১২

শেয়ার

শেয়ার

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে সামগ্রিক পণ্যমূল্য ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ার পূর্বাভাস ৩২ শতাংশ। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, সার ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে খাদ্যপণ্যের বাজারেও চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। তেলের মজুত কমে যাওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তার কারণে জ্বালানির দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম গড়ে ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও উচ্চপর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৯ ডলার। ২০২৬ সালে তা বেড়ে গড়ে ৯১ ডলারে দাঁড়াতে পারে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে ২০২৭ সালে তেলের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলারে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোর আরও ক্ষতি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। সরবরাহের এই সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।

জ্বালানির পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে আরও ৭ শতাংশ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। দুই বছরের সম্মিলিত হিসাবে খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে।

বিশ্ববাজারে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন, জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য এবং এল নিনোর কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষ করে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে জ্বালানি এবং সার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হওয়ায় এসবের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব খাদ্যপণ্যের বাজারে পড়তে পারে।

এ ছাড়া কৃষিপণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে গমসহ বিভিন্ন শস্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সারের দাম ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে। বছরের শুরুর দিকে ইউরিয়ার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার পর কিছুটা কমলেও সারবাজারে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

সারের দাম বাড়লে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষককে বেশি দামে সার কিনতে হয়, আবার কেউ কেউ ব্যয় সামলাতে সারের ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারেন। উভয় পরিস্থিতিই কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জ্বালানি, সার ও পরিবহন ব্যয় একসঙ্গে বাড়তে থাকলে খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় আরও বেশি হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু এসব পণ্যের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন, পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। অন্যদিকে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ভোগব্যয়, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও চাপে পড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে সামগ্রিক পণ্যমূল্য ২৩ শতাংশ বাড়লেও ২০২৭ সালে তা ৭ শতাংশ কমতে পারে। তবে এই সম্ভাব্য পতন নির্ভর করবে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, জ্বালানি সরবরাহের পরিস্থিতি এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ঝুঁকি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে তার ওপর।

বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা অনুযায়ী, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। কারণ, তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্য ও জ্বালানির মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় হয়।

পণ্যমূল্য দ্রুত বাড়লেও আয় একই হারে না বাড়লে এসব পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ঋণের বোঝা বেশি এমন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও জরুরি সহায়তা অর্থায়ন করাও কঠিন হতে পারে।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের জন্য বিদ্যমান অর্থায়ন ব্যবস্থার আওতায় ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে আগে থেকে নির্ধারিত অর্থায়ন রয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলার।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং বৈরী আবহাওয়ার সম্মিলিত প্রভাব বিশ্ববাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

ChannelNRB Footer