News Ticker
221.png

ইন্দোনেশিয়ায় বায়ুদূষণে এক মাসে ৩৫৬০ জনের মৃত্যু

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:১২

শেয়ার

শেয়ার

ইন্দোনেশিয়ায় বায়ুদূষণে এক মাসে ৩৫৬০ জনের মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ বায়ুদূষণের কারণে সেপ্টেম্বর মাসে আনুমানিক ৩ হাজার ৫৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক মাস ধরে চলা বন ও ভূমির দাবানল থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়াকে এসব মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৫ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ অস্বাস্থ্যকর থেকে বিপজ্জনক মাত্রার বায়ুদূষণের মধ্যে ছিলেন।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে হেলসিঙ্কিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ)। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষণার এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দাবানলের ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট পিএম২.৫ দূষণের স্বল্পমেয়াদি সংস্পর্শে আনুমানিক ৩ হাজার ৫৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগস্ট মাসে একই কারণে মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭০০। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে দাবানলজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, যানবাহন ও অন্যান্য নগর দূষণের কারণে সেপ্টেম্বর মাসে আরও আনুমানিক ১ হাজার ৭৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে ওই মাসে ইন্দোনেশিয়ায় বায়ুদূষণজনিত মোট আনুমানিক মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩১০ জনে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার কালিমানতান ও সুমাত্রা অঞ্চলে দাবানলের প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ। কালিমানতানের পশ্চিম, দক্ষিণ, মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে সেপ্টেম্বর মাসে বায়ুদূষণজনিত আনুমানিক ১ হাজার ৪৭০টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এসব মৃত্যুর ৯৪ থেকে ৯৯ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল বন ও ভূমিতে লাগা আগুনের ধোঁয়া।

অন্যদিকে সুমাত্রার পাঁচটি প্রদেশে দাবানলজনিত বায়ুদূষণে আনুমানিক ১ হাজার ৪২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব অঞ্চলের কয়েকটি প্রদেশে মোট দূষণজনিত মৃত্যুর ৯০ শতাংশের বেশি ঘটেছে দাবানলের ধোঁয়ার কারণে।

তবে দেশটির সবচেয়ে জনবহুল দ্বীপ জাভার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে শিল্পকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের নির্গমন এবং বর্জ্য পোড়ানোর মতো কার্যক্রম বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সিআরইএর গবেষণায় দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে ইন্দোনেশিয়ায় অস্বাস্থ্যকর থেকে বিপজ্জনক মাত্রার বাতাসের সংস্পর্শে থাকা মানুষের সংখ্যা সর্বোচ্চ প্রায় ৫ কোটি ৭৮ লাখে পৌঁছায়। আগস্ট মাসে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি ১৩ লাখ।

অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দূষিত বাতাসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

কালিমানতানে পরিস্থিতি ছিল আরও উদ্বেগজনক। সেখানে বিপজ্জনক মাত্রার দূষিত বাতাসে শ্বাস নিতে হয়েছে প্রায় ৬৪ লাখ মানুষকে। আগস্ট মাসে এই সংখ্যা ছিল ২৮ লাখ।

সুমাত্রায় এক দিনে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ১৪ লাখ এবং জাভায় প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ অস্বাস্থ্যকর বাতাসের সংস্পর্শে ছিলেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, সেপ্টেম্বর মাসে ইন্দোনেশিয়ায় বাতাসে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম২.৫-এর জনসংখ্যা-ভারিত গড় ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৩৬ মাইক্রোগ্রাম। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত বার্ষিক নির্দেশক মাত্রা মাত্র ৫ মাইক্রোগ্রাম।

অর্থাৎ দেশটির জাতীয় গড় দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার সাত গুণেরও বেশি ছিল।

কালিমানতানে পিএম২.৫-এর গড় ঘনত্ব আগস্টের ৫৭ মাইক্রোগ্রাম থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ১২০ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছায়। সুমাত্রায় এই মাত্রা ছিল ৫১ মাইক্রোগ্রাম এবং জাভায় ২৬ মাইক্রোগ্রাম।

পিএম২.৫ হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র দূষিত কণা, যা মানুষের ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং রক্তপ্রবাহেও পৌঁছাতে পারে। দীর্ঘ সময় এসব কণার সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বায়ুদূষণের কারণে ইন্দোনেশিয়ায় শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত দাবানলকবলিত সাতটি প্রদেশে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের (এআরআই) ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ৭৫ হাজারের বেশি। অর্থাৎ আক্রান্তদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই শিশু।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ফুসফুসের বিকাশ চলমান থাকায় দূষিত বাতাসের ক্ষতিকর প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়তে পারে। এ ছাড়া বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

ইন্দোনেশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলা দাবানলের অন্যতম কারণ হিসেবে খরা ও এল নিনো-সম্পর্কিত আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বনভূমি পরিষ্কার করতে আগুনের ব্যবহার, পিটল্যান্ড বা জলাভূমি শুকিয়ে ফেলা এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনাও আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বন উজাড় পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নুসান্তারা অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাবানলে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি জমি পুড়ে গেছে। তবে এ হিসাব ইন্দোনেশিয়ার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত বা প্রত্যাখ্যান করেনি।

দাবানলের ধোঁয়া শুধু ইন্দোনেশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বাতাসের প্রবাহের কারণে পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতেও ধোঁয়াজনিত দূষণের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দাবানল নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইন্দোনেশিয়া সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দাবানল নিয়ন্ত্রণ ও কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের কার্যক্রমে ৭২ হাজারের বেশি কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ২ হাজার ১০০-এর বেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ৫৩ লাখ মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে।

তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সাময়িকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিলে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের সমাধান হবে না। বনভূমি ও জলাভূমি সংরক্ষণ, অবৈধভাবে জমি পরিষ্কারে আগুনের ব্যবহার বন্ধ এবং শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সিআরইএর গবেষকরা ইন্দোনেশিয়া সরকারকে দাবানল মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে পিটল্যান্ড পুনরুদ্ধার, বনভূমিতে অবৈধ অগ্নিসংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে জাভার মতো জনবহুল অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও যানবাহনের নির্গমন কমাতে কার্যকর পরিবেশনীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গবেষণাটি স্পষ্ট করেছে, ইন্দোনেশিয়ার বায়ুদূষণ সংকটের পেছনে শুধু দাবানল নয়, বরং দীর্ঘদিনের নগর ও শিল্পদূষণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশটির জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

ChannelNRB Footer