News Ticker
221.png

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার হামলার শিকার বাইনান্স, খোয়া গেছে ৬৩০ কোটি ডলার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:০৩

শেয়ার

শেয়ার

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার হামলার শিকার বাইনান্স, খোয়া গেছে ৬৩০ কোটি ডলার
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইনান্সে ভয়াবহ সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার (৬.৩ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের ক্রিপ্টো সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সংঘটিত এ হামলাকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মাত্র ২০ মিনিটের মতো সময়ের মধ্যে বাইনান্সের বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টো সম্পদ সরিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারণা, এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে।

হামলার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাইনান্স সাময়িকভাবে আমানত ও উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্লকচেইন প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সহযোগিতায় চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

২৯ অক্টোবর রাতের দিকে বাইনান্সের বিভিন্ন ক্রিপ্টো ওয়ালেট থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়। হামলার বড় অংশটি প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়।

ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এলিপটিকের (Elliptic) হিসাব অনুযায়ী, চুরি হওয়া সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬৪৩ কোটি ডলার। অন্যদিকে বাইনান্সের নিজস্ব প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার।

হামলায় বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, ইউএসডিটি ও ইউএসডিসিসহ বিভিন্ন ধরনের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়েছে। একাধিক ব্লকচেইনে পরিচালিত ডিজিটাল ওয়ালেটগুলো থেকে এসব সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পদের পরিমাণ ও হামলার বিস্তৃতি বিবেচনায় এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা।

বাইনান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির একজন ডেভঅপস (DevOps) প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক করার মাধ্যমে হামলাকারীরা প্রথমে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে।

এরপর একটি সার্ভিস কনটেইনারে প্রবেশাধিকার পেয়ে অনুমোদনহীন উত্তোলন লেনদেন সম্পন্ন করে তারা।

প্রাথমিক তদন্তে একটি কম্পিউটারকে হামলার সম্ভাব্য প্রবেশপথ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও পরবর্তী তদন্তে আরও কয়েকটি নিরাপত্তা দুর্বলতার সন্ধান পেয়েছে বাইনান্স।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ডিজিটাল ওয়ালেটের প্রাইভেট কি বা গোপন নিরাপত্তা চাবি ফাঁস হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে পুরো হামলার কৌশল ও নিরাপত্তা লঙ্ঘনের পথ শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

ব্লকচেইন গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস (TRM Labs) ও চেইনঅ্যানালাইসিস (Chainalysis) হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের সম্পৃক্ততার জোরালো ইঙ্গিত পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্রেডারট্রেইটর (TraderTraitor) নামের হ্যাকার গোষ্ঠী এ হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। গোষ্ঠীটি লাজারাস গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন সাইবার নিরাপত্তা গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, বাইনান্সে হামলার পদ্ধতির সঙ্গে অতীতে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের চালানো কয়েকটি বড় সাইবার হামলার মিল রয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত বাইনান্সের তদন্ত বা কোনো সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে হামলাকারীদের পরিচয় চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

হামলার পর চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে।

বাইনান্স জানিয়েছে, ব্লকচেইন অংশীদারদের সহযোগিতায় প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করা সম্ভব হয়েছে।

এর মধ্যে টেথার (Tether) প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ এবং সার্কেল (Circle) ৮০ কোটির বেশি ডলারের ইউএসডিসি জব্দ করেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

এ ছাড়া অন্যান্য ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানও সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও সম্পদ আটকে রাখতে সহযোগিতা করছে।

তবে চুরি হওয়া অর্থের বাকি অংশের অবস্থান সম্পর্কে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। হ্যাকাররা এসব সম্পদের একটি অংশ অন্য ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেটে স্থানান্তরের চেষ্টা করছে বলে ব্লকচেইন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

হামলার পর গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও বাইনান্সের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে গ্রাহকদের অর্থের ক্ষতি প্রতিষ্ঠানটি বহন করবে।

বাইনান্সের সহ-প্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ রাখতে এবং হ্যাকিংয়ের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি পূরণে প্রতিষ্ঠানটি দায়বদ্ধ।

প্রতিষ্ঠানটি তাদের সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজার্স (SAFU) এবং নিজস্ব অর্থ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

বাইনান্সের দাবি, ব্যবহারকারীদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে নিরাপত্তা যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু লেনদেন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

সাইবার হামলার পর বাইনান্স সাময়িকভাবে আমানত ও উত্তোলন কার্যক্রম স্থগিত করে। এতে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ হলে ধাপে ধাপে লেনদেন কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হবে। ৩০ অক্টোবরের এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তোলন কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে প্রায় ৪৫ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে বলে সে সময় জানানো হয়েছিল।

এদিকে বাইনান্সের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাও তদন্তে সহযোগিতা করছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এবং ইউএস সিক্রেট সার্ভিসও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

বাইনান্সে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে দরপতন দেখা যায়।

হামলার খবরের পর বিটকয়েনের দাম ছয় সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। একই সময়ে ইথেরিয়ামের দামও কমে যায়। বাইনান্সের নিজস্ব ক্রিপ্টো টোকেন বিএনবির (BNB) দামেও উল্লেখযোগ্য পতন ঘটে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েই যখন বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়, তখন পুরো ডিজিটাল সম্পদ বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে।

বাইনান্স জানিয়েছে, হামলার পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ শেষ হলে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের সম্পদের নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানের রিজার্ভ সংক্রান্ত তথ্যও হালনাগাদ করা হবে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন বিশ্লেষক ও সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো চুরি হওয়া সম্পদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যর্থতার বিষয় নয়; বরং বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ChannelNRB Footer