কুকুর মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধু—এ কথা সবারই জানা। কিন্তু কোনো কুকুরকে রাজকীয় পোশাকে সাজিয়ে পালকিতে বসিয়ে পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে শোভাযাত্রা করার কথা শুনেছেন কি? চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গ্রামে শতাব্দীপ্রাচীন এমনই এক ব্যতিক্রমী উৎসব পালন করে আসছে মিয়াও জনগোষ্ঠী। উৎসবের প্রধান আকর্ষণ একটি কুকুর। তাকে ঘিরেই চলে বর্ণিল আয়োজন, নাচ-গান ও নানা ঐতিহ্যবাহী আচার।
চীনের গুইঝৌ প্রদেশের জিয়ানহে কাউন্টির জিয়াওবাং গ্রামে পালিত হয় এই উৎসব। স্থানীয়ভাবে এর নাম ‘তাই গোউ জিয়ে’ (Tai Gou Jie)। ইংরেজিতে এটি পরিচিত ‘ডগ ক্যারিং ফেস্টিভ্যাল’ বা কুকুর বহন উৎসব নামে।
প্রতি বছর চন্দ্রপঞ্জিকার সপ্তম মাসে এই উৎসব আয়োজন করা হয়। স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, পূর্বপুরুষদের জীবন রক্ষায় কুকুরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই এই উৎসবের প্রচলন। ২০১৫ সালে ঐতিহ্যটি স্থানীয় অবস্তুগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো একটি কুকুরকে বিশেষভাবে সাজিয়ে সম্মানের সঙ্গে গ্রাম ঘুরিয়ে আনা। এ জন্য গ্রামবাসীরা একটি কুকুর নির্বাচন করেন। ঐতিহ্যগতভাবে সাদা রঙের স্ত্রী কুকুরকে বেছে নেওয়ার প্রচলন থাকলেও বর্তমানে পূর্ণবয়স্ক পুরুষ কুকুর এবং স্থানীয় শিয়াসি জাতের কুকুরকেও নির্বাচন করা হয়।
নির্বাচিত কুকুরটিকে পরানো হয় মিয়াও জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক। মাথায় থাকে হাতে তৈরি বাঘের মুখের আদলে বিশেষ টুপি। গলায় পরানো হয় রুপার অলংকার বা আংটি।
এরপর তাকে বসানো হয় বাঁশের তৈরি বিশেষ পালকিতে। গ্রামবাসীরা কাঁধে করে সেই পালকি নিয়ে পুরো গ্রামে শোভাযাত্রা বের করেন। শোভাযাত্রার সঙ্গে থাকেন একজন ধর্মীয় আচার পালনকারী ব্যক্তি, যিনি ঐতিহ্যবাহী মন্ত্র ও ধর্মীয় বাণী পাঠ করেন।
ঢাক-ঢোলের শব্দ, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, নাচ-গান এবং মানুষের উচ্ছ্বাসে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম।
কুকুরকে ঘিরে এই ব্যতিক্রমী উৎসবের পেছনে রয়েছে মিয়াও জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রচলিত দুটি লোককাহিনি।
প্রথম কাহিনিটি ভয়াবহ খরার সময়কে ঘিরে। স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, একসময় ওই অঞ্চলে দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় বিপাকে পড়েন গ্রামবাসীরা।
এমন পরিস্থিতিতে গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি স্বপ্নে দেবতার নির্দেশনা পান। তাকে জানানো হয়, একটি কুকুরকে সঙ্গে নিয়ে প্রার্থনা করলে বৃষ্টি হতে পারে। পরে গ্রামবাসীরা সেই নির্দেশনা অনুসারে প্রার্থনা করেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এরপর বৃষ্টি হয় এবং ফসল রক্ষা পায়।
দ্বিতীয় কাহিনিটি আরও চমকপ্রদ। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, একসময় ওই অঞ্চলের আদি বাসিন্দারা পানির সংকটে পড়েছিলেন। তখন একটি কুকুর তাদের গোপন পানির উৎসের সন্ধান দিয়েছিল। এর ফলে প্রাণে বেঁচে যান পূর্বপুরুষেরা।
গুইঝৌ অঞ্চল চুনাপাথরের পাহাড়, গুহা ও ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহের জন্য পরিচিত। এসব এলাকায় পানির উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই কুকুরের মাধ্যমে পানির সন্ধান পাওয়ার এই গল্প স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
এই দুটি লোককাহিনিই কুকুরের প্রতি মিয়াও জনগোষ্ঠীর কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার অন্যতম সাংস্কৃতিক ভিত্তি।
কুকুরকে পালকিতে বসিয়ে শোভাযাত্রা বের করাই উৎসবের একমাত্র আয়োজন নয়। গ্রামের সীমানা পেরিয়ে আশপাশের কৃষিজমিতেও যায় শোভাযাত্রা।
সেখানে ঢাক-ঢোলের তালে নাচ-গান করেন গ্রামবাসীরা। একে অপরের গায়ে কাদা ছুড়ে দেওয়ার মতো ব্যতিক্রমী আচারও পালন করা হয়।
স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এসব আয়োজনের মাধ্যমে অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সুস্বাস্থ্য ও ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করা হয়। কৃষিনির্ভর সমাজে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং জীবিকার নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা এই উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।
উৎসবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিশুদের কল্যাণ কামনার একটি বিশেষ রীতি।
প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, অবিবাহিত তরুণীরা পিঠে কুকুরছানা নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে যান। সেখান থেকে সংগ্রহ করেন চাল ও খাবার। পরে সম্প্রদায়ের একজন সম্মানিত প্রবীণ ব্যক্তি সেই খাবার শিশুদের মধ্যে বিতরণ করেন।
স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আয়োজন শিশুদের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনার প্রতীক।
মিয়াও জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাদের লোককাহিনিতে মানুষ, পশুপাখি ও প্রকৃতির মধ্যে গভীর সম্পর্কের কথা উঠে আসে।
তাদের মধ্যে ‘বাটারফ্লাই মাদার’ বা প্রজাপতি মাকে ঘিরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। লোককাহিনি অনুযায়ী, প্রজাপতি মায়ের জন্ম হয়েছিল ম্যাপল গাছ থেকে। পরে তার দেওয়া ১২টি ডিম থেকে মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর উৎপত্তি হয়।
এ ছাড়া গোল্ডেন ফিজ্যান্ট বা সোনালি তিতার পাখির প্রতিও তাদের বিশেষ শ্রদ্ধা রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পাখি একসময় তাদের পূর্বপুরুষদের বাজরার বীজ এনে দিয়েছিল, যা দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচতে সহায়তা করেছিল। পাখিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে মিয়াও জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের প্রচলন রয়েছে।
আধুনিকতার প্রভাবেও মিয়াও জনগোষ্ঠীর এই ঐতিহ্য টিকে রয়েছে। উৎসবের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে পূর্বপুরুষদের গল্প, লোকবিশ্বাস এবং প্রাণীর প্রতি কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের কাছে ডগ ক্যারিং ফেস্টিভ্যাল কেবল একটি আনন্দ আয়োজন নয়; এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ইতিহাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের প্রতীক।
একটি কুকুরকে পালকিতে বসিয়ে সম্মান জানানোর এই ব্যতিক্রমী আয়োজন বিশ্ববাসীর কাছে চীনের বৈচিত্র্যময় লোকসংস্কৃতির একটি বিশেষ দিক তুলে ধরেছে। মানুষের বিপদে প্রাণীর ভূমিকা, কৃতজ্ঞতা এবং সহাবস্থানের বার্তাই যেন বহন করে চলেছে শতাব্দীপ্রাচীন এই উৎসব।
আরও পড়ুন:







