‘সেক্স মন্ত্রণালয়’ গঠনের বিতর্কিত প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তুমুল সংঘর্ষে জড়িয়েছেন আর্মেনিয়ার পার্লামেন্টের সরকারি ও বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা। দেশটির জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে শুরু হওয়া বাকবিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতি, কিল-ঘুষি ও চেয়ার ছোড়াছুড়িতে রূপ নেয়। সংঘর্ষে কয়েকজন সংসদ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তাকর্মীদের হস্তক্ষেপ করতে হয়।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে জাতীয় সংসদে এ ঘটনা ঘটে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির ক্ষমতাসীন ‘সিভিল কন্ট্রাক্ট’ পার্টি ও বিরোধী দল ‘স্ট্রং আর্মেনিয়া’র সংসদ সদস্যদের মধ্যে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। একটি নিয়মিত সংসদীয় আলোচনার সময় কয়েক মাস আগের একটি বিতর্কিত মন্তব্য সামনে আনেন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য তারন চাখোয়ান। এরপরই বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়।
সংসদে অডিট চেম্বারের একজন সদস্য নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছিল। এ সময় ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য তারন চাখোয়ান বিরোধী দল ‘স্ট্রং আর্মেনিয়া’র নেতা নারেক কারাপেতিয়ানের পরিবারের সদস্যদের প্রসঙ্গ টেনে বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, কারাপেতিয়ানের পরিবারের একাধিক সদস্য রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এমনকি তার এক আত্মীয় নারীদের সন্তুষ্ট করার জন্য একটি বিশেষ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছিলেন। ওই বক্তব্যের জন্য এখনো নারীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ বক্তব্যের পর বিরোধী নেতা নারেক কারাপেতিয়ান নিজের আসন থেকে প্রতিবাদ জানান। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য আসন ছেড়ে সামনে এগিয়ে আসেন।
এরপরই শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতি। সংসদ সদস্যদের একাংশকে একে অপরের দিকে ঘুষি ছুড়তে দেখা যায়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
সংঘর্ষের সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্য ছিল সংসদ অধিবেশনকক্ষে চেয়ার ছোড়ার ঘটনা। সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, সংসদের ডেপুটি স্পিকার ভাহাগন আলেকসানিয়ান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের দিকে একটি চেয়ার ছুড়ে মারছেন।
এ সময় দুই পক্ষের সংসদ সদস্যদের মধ্যে ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। কেউ কারও জামার কলার ধরে টানছেন, কেউ ঘুষি ছুড়ছেন। একপর্যায়ে সংসদের ভেতরের পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তাকর্মীদের ডাকা হয়।
সংঘর্ষে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য আন্দ্রানিক গেভরগিয়ানকে নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। আরেক সংসদ সদস্য রুবেন মখিতারিয়ানের পোশাক ছিঁড়ে যায় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্সও ডাকা হয়।
সংঘর্ষের পেছনে রয়েছে কয়েক মাস আগের একটি বিতর্কিত মন্তব্য। বিরোধী দল ‘স্ট্রং আর্মেনিয়া’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সার্গিস কারাপেতিয়ান একটি পডকাস্টে আর্মেনিয়ার জনসংখ্যা হ্রাস ও জন্মহার কমে যাওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় ‘সেক্স মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ তোলেন।
সেখানে তিনি মন্তব্য করেন, একটি শক্তিশালী আর্মেনিয়ায় কোনো নারী অসন্তুষ্ট থাকবেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যৌন অসন্তুষ্টির বিষয়টি সমাধান না করে জনসংখ্যাগত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, নারীদের যৌন অসন্তুষ্টি দূর করতে একটি বিশেষ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার ধারণা বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে বিষয়টি নিয়ে আর্মেনিয়ার নারী অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন মহলে সমালোচনা তৈরি হয়। অনেকেই এমন বক্তব্যকে নারীদের প্রতি অসম্মানজনক বলে মনে করেন।
এ মন্তব্যের সঙ্গে বিরোধী দলের নেতা নারেক কারাপেতিয়ানের পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় সংসদে তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পরও প্রথমদিকে অধিবেশন স্থগিত করেননি সংসদের স্পিকার রুবেন রুবিনিয়ান। বরং সংসদের সরাসরি সম্প্রচার চালু রেখে তিনি সংসদ সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সবাই যেন পরিস্থিতি দেখতে পারেন, সে কারণেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে অধিবেশন বন্ধ করছেন না।
তবে সংঘর্ষ আরও ছড়িয়ে পড়লে শেষ পর্যন্ত অধিবেশনে বিরতি ঘোষণা করেন স্পিকার। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা সংসদকক্ষে প্রবেশ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
ঘটনার পর আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানান।
তিনি বলেন, তার দলের সংসদ সদস্যদের পদক্ষেপকে তিনি স্বাগত ও সমর্থন করেন। প্রয়োজনে চেয়ার বা অন্য কিছু ব্যবহার করাও যথাযথ প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনায় সরকারপ্রধানের এমন অবস্থান রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও বাড়িয়েছে।
আর্মেনিয়ার সংসদে সংঘর্ষের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।
আরও পড়ুন:







