News Ticker
221.png

এআইয়ের ধাক্কায় একদিনে ৫০০ বিলিয়ন ডলার হারাল গুগল!

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:০২

শেয়ার

শেয়ার

এআইয়ের ধাক্কায় একদিনে ৫০০ বিলিয়ন ডলার হারাল গুগল!
ছবি: সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বাজারে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিযোগিতায় এবার বড় ধাক্কা খেল প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল। একদিনেই প্রতিষ্ঠানটির মূল কোম্পানি অ্যালফাবেটের বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারের দর ১২ শতাংশের বেশি পড়ে যাওয়ায় প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এ ঘটনা।

গত ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে অ্যালফাবেটের শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন ঘটে। দিন শেষে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে যায়। এতে একদিনে বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৪৯৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার মুছে যায়।

শেয়ারবাজারের ইতিহাসে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের একদিনে বাজারমূল্য হারানোর অন্যতম বড় ঘটনা এটি। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিপুল অর্থ ব্যয় করে এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন করলেও সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা আসবে কি না।

বিশ্লেষকদের মতে, গুগলের শেয়ারের দরপতনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কোম্পানিটির তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল নিয়ে বিনিয়োগকারীদের হতাশা।

অ্যালফাবেটের আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে। বিশেষ করে গুগলের মূল আয়ের উৎস সার্চ বিজ্ঞাপনের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হয়ে এসেছে। অন্যদিকে এআই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, এআই প্রযুক্তির কারণে মানুষ প্রচলিত সার্চ ইঞ্জিনের পরিবর্তে চ্যাটবট ও এআই সহকারীর ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করলে গুগলের বিজ্ঞাপনভিত্তিক ব্যবসা চাপে পড়তে পারে।

বিশেষ করে ChatGPT ও Claude-এর মতো এআইভিত্তিক সেবাগুলো প্রচলিত সার্চ ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে ওঠায় গুগলের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এআই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না থাকতে গুগল ডেটা সেন্টার, শক্তিশালী কম্পিউটিং চিপ, সার্ভার এবং এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে।

২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে অ্যালফাবেটের মূলধনী ব্যয় ৫১ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। একই সময়ে কোম্পানিটির ফ্রি ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক ৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।

অর্থাৎ, পরিচালন কার্যক্রম থেকে বিনিয়োগের পর যে নগদ অর্থ অবশিষ্ট থাকার কথা, সেই হিসাবে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানিটির ব্যয় ও ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

কোম্পানিটি আগামী বছরও এআই অবকাঠামোতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

গুগলের সবচেয়ে বড় শক্তি দীর্ঘদিন ধরে তার সার্চ ইঞ্জিন ও অনলাইন বিজ্ঞাপন ব্যবসা। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তথ্য খুঁজতে গুগল ব্যবহার করেন। এই সার্চ ব্যবস্থার বিজ্ঞাপন থেকেই কোম্পানিটির বড় অংশের আয় আসে।

কিন্তু জেনারেটিভ এআইয়ের বিস্তারের ফলে মানুষের তথ্য খোঁজার অভ্যাস বদলাচ্ছে। এখন অনেকেই সরাসরি প্রশ্নের উত্তর পেতে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করছেন।

বিশেষ করে গুগলের নিজস্ব এআই সার্চ ফিচার ‘এআই মোড’ থেকেও প্রচলিত সার্চের তুলনায় কম বিজ্ঞাপন আয় হচ্ছে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে গুগলের সার্চ বিজ্ঞাপনের আয় ১২ শতাংশ বেড়েছে। তবে আগের প্রান্তিকগুলোর তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ এটি।

শেয়ারবাজারে বড় ধাক্কা খেলেও গুগলের সব ব্যবসার পরিস্থিতি খারাপ নয়। বিশেষ করে গুগল ক্লাউড ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

তৃতীয় প্রান্তিকে গুগল ক্লাউডের আয় বেড়ে প্রায় ৩০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এআই প্রযুক্তি ও ক্লাউড সেবার চাহিদা বৃদ্ধিই এ প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

একই সময়ে অ্যালফাবেটের মোট আয় ছিল প্রায় ১২৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে এই আয় বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের তুলনায় কিছুটা কম ছিল। কোম্পানির নিট মুনাফাও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে।

এআই প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে শুধু গুগল নয়, অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগকারীদের কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, মেটা ও ওরাকলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। বিনিয়োগকারীরা এখন জানতে চাইছেন, এসব ব্যয়ের বিপরীতে কত দ্রুত আয় ও মুনাফা বাড়বে।

গুগলের শেয়ারের দরপতনের দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচকও ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমে যায়। এতে বোঝা যায়, একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল কীভাবে পুরো শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এআই এখন শুধু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতা নয়; এটি ব্যবসায়িক মুনাফা ধরে রাখারও লড়াই।

গুগলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো, একদিকে এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব ধরে রাখা, অন্যদিকে নিজেদের প্রচলিত সার্চ ও বিজ্ঞাপন ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করা।

বিপুল বিনিয়োগের পরও যদি এআই থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা না আসে, তাহলে গুগলসহ অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

তবে গুগলের শক্তিশালী ক্লাউড ব্যবসা, বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি এবং নিজস্ব এআই মডেল ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন সম্ভাবনাও দিতে পারে।

সব মিলিয়ে একদিনে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারানোর ঘটনা প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ থাকলেও বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু প্রযুক্তির সম্ভাবনা নয়, এর প্রকৃত আর্থিক সুফলও দেখতে চাইছেন।

ChannelNRB Footer