রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে কৃষ্ণসাগরের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কৃষ্ণসাগরে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ডলফিন ও অন্যান্য সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনের এক সামুদ্রিক গবেষক। সামরিক জাহাজের সোনার প্রযুক্তি, বিস্ফোরণ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সমুদ্রের পানিতে রাসায়নিক দূষণকে এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের তুজলি লেগুনস ন্যাশনাল নেচার পার্কের প্রধান গবেষক ইভান রুসেভ জানিয়েছেন, ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কৃষ্ণসাগরে ডলফিনসহ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়েছে।
গবেষকের হিসাবে, এই সংখ্যা কৃষ্ণসাগরের মোট সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তবে এটি সরাসরি গণনা করা মৃত প্রাণীর সংখ্যা নয়; উপকূলে ভেসে আসা মৃতদেহ ও অন্যান্য পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে করা একটি আনুমানিক হিসাব।
ডলফিনের বেঁচে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো ইকোলোকেশন। এই পদ্ধতিতে তারা শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে পানির নিচে চলাচল, খাবার খোঁজা এবং আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পায়।
কিন্তু কৃষ্ণসাগরে সামরিক জাহাজ ও সাবমেরিনের সোনার ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ এবং বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ ডলফিনের এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
গবেষকদের মতে, পানির নিচে তীব্র শব্দের কারণে ডলফিন দিকনির্দেশনা হারাতে পারে। ফলে তারা খাবার খুঁজে পেতে, একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং নিরাপদে চলাচল করতে সমস্যায় পড়ে।
খাবার সংগ্রহে ব্যর্থ হলে ডলফিনের শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। একপর্যায়ে অনাহার, শারীরিক জটিলতা ও সংক্রমণে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।
যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগরের পানিতে বিভিন্ন ধরনের দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। সামরিক জাহাজ ও তেলবাহী জাহাজে হামলা, জ্বালানি তেল নিঃসরণ এবং ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে রাসায়নিক পদার্থ পানিতে মিশছে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালে ইউক্রেনের কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের ঘটনায় বিপুল পরিমাণ পানি ও দূষিত পদার্থ দনিপ্রো নদী হয়ে কৃষ্ণসাগরে প্রবাহিত হয়।
এসব দূষণের মধ্যে রয়েছে ভারী ধাতু, জ্বালানি তেল, কৃষিজ রাসায়নিক এবং অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ।
ডলফিন খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরের স্তরে অবস্থান করায় মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর মাধ্যমে এসব দূষিত পদার্থ তাদের শরীরেও জমা হতে পারে। ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেন, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও তুরস্কের কৃষ্ণসাগর উপকূলে বিপুলসংখ্যক মৃত ডলফিন ও অন্যান্য সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেহ পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, উপকূলে যত মৃত প্রাণীর দেহ পাওয়া যায়, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। কারণ মৃত প্রাণীর অধিকাংশই সমুদ্রের তলদেশে ডুবে যায় অথবা অন্য সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হয়।
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত কৃষ্ণসাগরের উপকূলে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মৃত সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। গবেষকেরা হিসাব করে ওই তিন মাসে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৭ হাজার ৫০০ থেকে ৪৮ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা দেন।
ইউক্রেনের গবেষক ইভান রুসেভের ধারণা, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষ্ণসাগরের সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর সংখ্যা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না।
তার মতে, আগের অবস্থায় ফিরতে ডলফিন ও অন্যান্য সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর ৩০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এর কারণ, ডলফিনের প্রজনন প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীর। তারা সাধারণত একটি বাচ্চা জন্ম দেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেটির পরিচর্যা করে। ফলে একবার বড় ধরনের জনসংখ্যাগত বিপর্যয় ঘটলে তা কাটিয়ে উঠতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব শুধু মানুষের জীবন ও অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষ্ণসাগরের সামুদ্রিক পরিবেশ, মাছ, পাখি এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীও এর ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
পরিবেশবিষয়ক গবেষকদের মতে, যুদ্ধ বন্ধ হলেও সমুদ্রের দূষণ, সামরিক বিস্ফোরণের প্রভাব এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া না হলে কৃষ্ণসাগরের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি আরও গভীর হতে পারে।
আরও পড়ুন:







