আবারও বিক্ষোভ-সংঘাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইউরোপের দেশ ফ্রান্স। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরকারি সেবার সংকোচন এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকটের প্রতিবাদে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো রাজপথে নেমেছেন লাখো মানুষ। শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। দিনের বেশির ভাগ সময় শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার দিকে কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বাধে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীদের ছোড়া পেট্রলবোমা ও বিভিন্ন বস্তুতে আহত হন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবারের বিক্ষোভ ও রাতের অভিযানে মোট ৭৭৯ জনকে আটক করা হয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত হিসাবের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে মোট ২৯১টি বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসেই বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ হাজার।
তবে আন্দোলন আয়োজকদের দাবি, দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। প্যারিসে অংশ নিয়েছেন প্রায় ২ লাখ মানুষ।
এ নিয়ে টানা তিন সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভ চলছে। এর আগে ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার এবং ১৭ অক্টোবরের আন্দোলনে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে সরকারি পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ আগের দুই সপ্তাহের তুলনায় এবার বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমলেও আন্দোলনের উত্তাপ এখনো কমেনি।
শনিবার প্যারিসে নির্ধারিত পথে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হলেও শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা একদল বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর, ইট ও অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপ করেন। কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পেট্রলবোমাও ছোড়েন।
জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। সংঘর্ষে অন্তত তিন পুলিশ সদস্য আহত হন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ সময় একটি গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে লিওঁ শহরে পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপের পর কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। তুলুজে অননুমোদিত বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। মার্সেইয়েও বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে ফরাসি সরকার। শনিবার প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ৯টা পর্যন্ত ৫৬৫ জনকে আটক করা হয়েছিল। হ্যালোইন উৎসবের রাতের অভিযানসহ পরবর্তী সময়ে আটকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭৯ জনে।
একই সময়ের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শনিবার রাত ৯টা পর্যন্ত ১১৬ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আহত হন। রাতের পরবর্তী অভিযানে আরও ৪৩ জন নিরাপত্তাকর্মী আহত হওয়ার তথ্য জানানো হয়।
এ ছাড়া বিক্ষোভ ও রাতের সহিংসতায় ৫১৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মোকাবিলা করতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তিনটি দোকানে লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, সরকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারকে সম্মান করে। তবে বিক্ষোভের নামে পুলিশের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রস্তুত রয়েছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের কর্মসূচি সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করা হলেও সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের অনুমতি ও চলাচলের পথ সীমিত করে তাদের প্রতিবাদের অধিকার বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়েও প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরোধ তৈরি হয়েছে।
শনিবারের বিক্ষোভের পরও ফ্রান্সে আন্দোলন থেমে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আগামী সোমবার থেকে স্কুলগুলোতে শরৎকালীন ছুটি শেষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। এরই মধ্যে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো মঙ্গলবার নতুন করে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
এ ছাড়া শ্রমিক সংগঠনগুলো বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। মজুরি, পেনশন, সরকারি পরিষেবা এবং বাজেট সংকোচনের প্রতিবাদে এসব কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে আবারও বড় ধরনের বিক্ষোভ ও সংঘাতের আশঙ্কা করছে প্রশাসন।
ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভ এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন দেশটিতে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হচ্ছে।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক চাপ ও সরকারি ঋণ বৃদ্ধির কারণে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের দাবি পূরণ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে সরকারকে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ নয়; এর সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ, সামাজিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতি অনাস্থার বিষয়গুলোও জড়িয়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন:







