News Ticker
221.png

বিক্ষোভে উত্তাল ভারতের মণিপুরে ভয়াবহ সংঘাত, নিহত ৫

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১ নভেম্বর, ২০২৬ ২০:৩০

আপডেট: ১ নভেম্বর, ২০২৬ ২০:৪৫

শেয়ার

শেয়ার

বিক্ষোভে উত্তাল ভারতের মণিপুরে ভয়াবহ সংঘাত, নিহত ৫
ছবি: সংগৃহীত

আবারও জাতিগত সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর। নতুন করে দুই পৃথক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন কুকি সম্প্রদায়ের সদস্য শনিবার (৩১ অক্টোবর) নোনে জেলায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলিতে নিহত হন। অন্যদিকে, কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ থাকা আরও দুই কুকি ব্যক্তির মরদেহ রোববার (১ নভেম্বর) সকালে কাংপোকপি জেলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

নতুন করে প্রাণহানির ঘটনায় রাজ্যজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী ইম্ফলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ভারত সরকারের চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের পদত্যাগ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষদের স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবিও উঠেছে।

রোববার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার মণিপুরের নোনে জেলার একটি এলাকায় দুই সশস্ত্র পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে কুকি সম্প্রদায়ের তিন ব্যক্তি নিহত হন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিদের মধ্যে গোলাগুলির সময় এ প্রাণহানি ঘটে। তবে কুকি সম্প্রদায়ের একটি শীর্ষ সংগঠন এ হত্যাকাণ্ডের জন্য নাগা বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে।

অন্যদিকে, কাংপোকপি জেলায় কয়েক দিন আগে নিখোঁজ হওয়া আরও দুই কুকি ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার সকালে নিরাপত্তা বাহিনী তল্লাশি অভিযান চালিয়ে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।

তবে এই দুই ব্যক্তির মৃত্যুর পেছনে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ। ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে।

নতুন করে প্রাণহানির ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে বড় ধরনের বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। Coordinating Committee on Manipur Integrity (COCOMI) নামের একটি নাগরিক সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন।

বিক্ষোভকারীরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ইয়ুমনাম খেমচাঁদ সিংয়ের পদত্যাগ দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, রাজ্যে বারবার সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও সরকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের হাতে বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। তারা রাজ্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরকারের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের দাবি জানান।

এ ছাড়া বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিরাপদ ও স্থায়ীভাবে নিজ নিজ এলাকায় ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিও তোলেন আন্দোলনকারীরা।

মণিপুরের চলমান উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার এবং কুকি-জো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত Suspension of Operations (SoO) চুক্তি।

২০০৮ সালের আগস্টে স্বাক্ষরিত এ চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ করা এবং রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান খুঁজে বের করা। চুক্তির আওতায় সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের নির্ধারিত ক্যাম্পে অবস্থান এবং অস্ত্র ব্যবহারে বিধিনিষেধ মেনে চলার কথা।

কিন্তু সাম্প্রতিক সহিংসতার পর চুক্তিটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এ চুক্তি কার্যকরভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। তাই চুক্তি বাতিল করে রাজ্যে নিরপেক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অন্যদিকে, কুকি সম্প্রদায়ের সংগঠনগুলোর অভিযোগ, তাদের জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনায় প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

মণিপুরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভূমি, পরিচয়, রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যকার সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কুকি সম্প্রদায়ের কয়েকজনের বিরুদ্ধে এক নাগা ব্যক্তিকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এর পর থেকে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

মে মাসে তিন কুকি ধর্মযাজক হত্যার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটে। ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করা হলেও অভিযোগটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অপহরণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে।

সাম্প্রতিক পাঁচজনের প্রাণহানি সেই সংঘাতকে আরও উসকে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মণিপুরে বর্তমান সংকটের সূত্রপাত ২০২৩ সালের মে মাসে। সে সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায় এবং কুকি-জো জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাতিগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

মূলত তফসিলি উপজাতির মর্যাদা, ভূমির অধিকার, সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় সংরক্ষণ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিরোধ থেকে এ সংঘাতের সূত্রপাত হয়।

পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, বাড়িঘরে হামলা ও হত্যাকাণ্ডে রাজ্যের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হন।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া বৃহত্তর জাতিগত সংঘাতে এ পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ। তাদের অনেকেই এখনো অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন।

নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর নোনে, কাংপোকপি ও আশপাশের স্পর্শকাতর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তল্লাশি ও নজরদারি কার্যক্রম চলছে।

অন্যদিকে, কাংপোকপি জেলায় কুকি সংগঠনগুলোর ডাকা বন্ধ কর্মসূচির কারণে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। তবে জরুরি চিকিৎসাসেবা, সংবাদমাধ্যম ও নিরাপত্তা বাহিনীর চলাচল অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংগঠন।

এদিকে, নাগা সংগঠনগুলোও পৃথক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের কাছে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানিয়েছে।

ChannelNRB Footer