যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ধারণ করতে পারবেন না বলেও সতর্ক করেছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার ইঙ্গিত দেওয়ার পর রোববার (১ নভেম্বর) ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এ বক্তব্য আসে।
ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধ আগের সংঘাতের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধের সময়সীমা কিংবা সমাপ্তির শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে থাকবে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্যে তিনি বলেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তার পরিণতি ও স্থায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী নাও হতে পারে।
তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা প্রশমনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও নতুন হামলার আশঙ্কা বাড়ছে।
এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আরও এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছে। তবে এখনো এক বা দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বাকি রয়েছে, যেগুলোতে হামলা চালাতে বেশি সময় লাগবে না।
তিনি ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের কথাও উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের পর ইরানের পক্ষ থেকে নতুন করে কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
ইরানের সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) পক্ষ থেকেও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে কোনো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা থাকবে না। শত্রুপক্ষের ক্ষতি করার জন্য বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘি বলেছেন, দেশটির ওপর যেকোনো হামলার জবাব দেওয়া হবে যথাযথ, চূড়ান্ত ও কার্যকরভাবে। ইরানের প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়ার পরিধি, সময় ও পরিণতি অন্য কেউ নির্ধারণ করতে পারবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। ওই হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিহত হন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়।
এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। লেবানন ও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
সামরিক হুঁশিয়ারির পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি ইরান।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইরান আত্মরক্ষা এবং কূটনীতি—উভয় পথের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনাও চলছে।
তবে এসব আলোচনার সফলতা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ইরানের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এ অবস্থায় সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:







