আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশটিতে ইবোলায় মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। প্রতিবেশী কয়েকটি দেশেও সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় পুরো আফ্রিকা মহাদেশে জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত ডিআর কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, দেশটিতে ইবোলায় মোট ১০ হাজার ৩৫১ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৫ হাজার ২৬ জন। অর্থাৎ আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ৭৮৮ জন।
চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে দেশটিতে নতুন করে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করা হয়। এবার সংক্রমণের জন্য দায়ী বান্দিবুগিও (Bundibugyo) প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
ডিআর কঙ্গোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ২৬টি প্রদেশের মধ্যে আটটিতে ইবোলার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। মোট ১৭৮টি স্বাস্থ্য অঞ্চলের মধ্যে ৬৭টিতে সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫০টি অঞ্চলে এখনো সক্রিয় সংক্রমণ রয়েছে।
দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি ও নর্থ কিভু প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পৌঁছাতে না পারার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ডিআর কঙ্গোর বাইরে আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও ইবোলার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় নতুন সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। উগান্ডাতেও এই প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। তবে দেশটিতে সর্বশেষ শনাক্ত রোগী সুস্থ হওয়ার পর নতুন সক্রিয় সংক্রমণের খবর নেই।
আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় সীমান্ত নজরদারি, যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের বড় কারণ হলো, নতুন সংক্রমণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আগে থেকে শনাক্ত করা রোগীর সংস্পর্শের তালিকার বাইরে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সংক্রমণের উৎস শনাক্ত এবং বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বান্দিবুগিও ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এই রোগের বিরুদ্ধে বর্তমানে অনুমোদিত নির্দিষ্ট টিকা বা চিকিৎসা নেই। ফলে আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং সহায়ক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাসের কারণে চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত করা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা মহামারিতে ১১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বর্তমান ডিআর কঙ্গোর প্রাদুর্ভাব ইতোমধ্যে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী এবং বিশ্ব ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং একাধিক দেশে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
আফ্রিকার এই ভয়াবহ ইবোলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন:







