দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কর্মদিবসেই দেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতের জন্য সরকারের বড় ধরনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন নতুন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনসের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, উড়োজাহাজের বহর সম্প্রসারণ, বিমানবন্দরের সেবার মান উন্নয়ন এবং যাত্রী হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (২৩ আগস্ট) বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রথম অফিস করেন মন্ত্রী। এ সময় মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের কাছে সরকারের পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন সংস্থাগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা দূর করাকে তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। কাজের গতি বাড়াতে প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতির বাইরে গিয়ে উদ্ভাবনী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
কাজের সুবিধার জন্য সপ্তাহের পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে অন্তত একদিন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) অথবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্যালয়ে বসার ইচ্ছার কথাও জানান মন্ত্রী। তার মতে, মাঠপর্যায়ের সমস্যা দ্রুত বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণে সরকারের অন্যতম বড় পরিকল্পনা হলো নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা। মন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অডিটে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় মান অর্জন করতে পারলে নিউইয়র্ক রুট চালুর পথ তৈরি হবে।
সবকিছু অনুকূলে থাকলে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকেই নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতেও সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বর্তমান উড়োজাহাজ সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট বাড়ানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিমানমন্ত্রী।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ না থাকায় ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এই সংকট কাটাতে পর্যায়ক্রমে অন্তত ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে লিজের বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন করে পরের বছর থেকেই নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া বোয়িংয়ের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় নতুন উড়োজাহাজ ২০৩১ সাল থেকে দেশে আসার কথা রয়েছে। তার আগ পর্যন্ত যাত্রীসেবা সচল রাখা এবং ফ্লাইট সম্প্রসারণের জন্য লিজে উড়োজাহাজ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নিয়েও সময়সূচি জানিয়েছেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, চলতি মাসের ২৫ আগস্ট জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্র জমা দেবে। এরপর দরপত্র মূল্যায়ন শেষে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে চুক্তি সই করার আশা করা হচ্ছে।
চুক্তির পর প্রায় সাড়ে তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করে আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনালের সফট ওপেনিং করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে কাজের মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সময় আরও এক থেকে দুই মাস বাড়ানো হতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করার বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিমানমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী অক্টোবরের মধ্যে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে বিমানবন্দরটির উদ্বোধন করার প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
ঈশ্বরদী বিমানবন্দর নিয়েও সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন মন্ত্রী। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে এ বিমানবন্দরকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সরকার।
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি সম্প্রসারণ করে অভ্যন্তরীণ কয়েকটি ফ্লাইট চালুর চেষ্টা করা হবে। এতে সেখানে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরটি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রয়োজনেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে বিমানবন্দরটির রানওয়ে প্রায় ৬ হাজার ফুট। এটিকে আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ ফুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে রানওয়ে সংস্কার এবং একটি ছোট টার্মিনাল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যাত্রী হয়রানি বন্ধের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন মন্ত্রী। তিনি জানান, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং কিছুটা সফলতাও এসেছে। তবে সমস্যাটি পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অন্যান্য কর্মকর্তা, বেবিচকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্যা সমাধানে কাজ করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
যাত্রীদের জন্য উন্নত ও রুচিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর ও উড়োজাহাজের পরিচ্ছন্নতার ওপরও জোর দিয়েছেন এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
তিনি বলেন, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে উড়োজাহাজ পর্যন্ত সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের সেবার মান উন্নত করে বিমান পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন:







