News Ticker
221.png

মক্কা চুক্তি কী ও বাংলাদেশ কেন এতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট, ২০২৬ ১৪:৫৮

শেয়ার

শেয়ার

মক্কা চুক্তি কী ও বাংলাদেশ কেন এতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে?
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘মক্কা চুক্তি’ বা Makkah Joint Defence Agreement। চলতি আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির মূল কথা হলো—এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন সদস্যের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ৭ আগস্ট ২০২৬, সৌদি আরবের মক্কায়। এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে এটিকে ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে তুলনা করা হলেও এটি এখনো ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়।

‘মক্কা চুক্তি’ বলতে এখানে মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট বোঝানো হচ্ছে। এটি ২০১৯ সালের ‘মক্কা সনদ’ বা Makkah Charter-এর সঙ্গে এক বিষয় নয়। বর্তমান চুক্তিটি মূলত একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্মিলিত প্রতিরক্ষা। অর্থাৎ চুক্তিভুক্ত কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি এতে রয়েছে। এর মাধ্যমে তিন দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চায়।

সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি শক্তি, তুরস্কের সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্প সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা—এই তিন দেশের সক্ষমতাকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার বিষয়টিও চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

বাংলাদেশ এখনো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের জুনিয়র পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চুক্তিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং ঢাকা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। 

বাংলাদেশের আগ্রহের পেছনে কয়েকটি কৌশলগত কারণ রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো

চুক্তিতে যোগ দিলে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হতে পারে। সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং যৌথ মহড়ার সুযোগ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। 

বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি সৌদি আরবে কাজ করেন এবং দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় রেমিট্যান্স উৎস। ফলে সৌদির সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও ঢাকার বিবেচনায় থাকতে পারে। 

চুক্তির দুই অন্য সদস্য তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। ফলে একই নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে থাকলে তিন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাত ও নিরাপত্তা সংকট বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিজের কৌশলগত অংশীদারিত্বের পরিসর বাড়াতে চাইতে পারে। 

চুক্তিতে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য শুধু সামরিক সুবিধার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বড় ধরনের কূটনৈতিক হিসাবও জড়িত।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। পাকিস্তান এই জোটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশ এতে যোগ দিলে নয়াদিল্লি বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান ভারতের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে। 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ভারসাম্য বজায় রাখা—ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা। কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দিলে সেই ভারসাম্য বজায় রাখা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে। 

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, চীন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্কের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তবে চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো এটিকে নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক জোট হিসেবে উপস্থাপন করেনি। 

মক্কা চুক্তিকে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলা হচ্ছে। কারণ ন্যাটোর মতোই এতে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ধারণা রয়েছে। তবে দুই জোটের মধ্যে বড় পার্থক্যও আছে।

ন্যাটোর রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সমন্বিত সামরিক কমান্ড, বিস্তৃত সদস্যপদ ও দীর্ঘমেয়াদি যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মক্কা চুক্তি এখনো মাত্র তিন সদস্যের একটি নতুন উদ্যোগ এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ন্যাটোর পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তের সামনে রয়েছে। চুক্তিতে যোগ দিলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

তাই ঢাকার সামনে মূল প্রশ্ন শুধু ‘মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া হবে কি না’ নয়; বরং যোগ দিলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ কতটা লাভবান হবে—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।

আরও পড়ুন:

ChannelNRB Footer