জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান মানবাধিকারকর্মী আইরিন জুবাইদা খান।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৮ আগস্ট) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব শুরু হলো।
এর আগে গত ৮ জুলাই আইরিন খানকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। একই সঙ্গে তাকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা, বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নিয়োগের পর নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে যোগ দিয়ে তিনি দায়িত্ব বুঝে নেন। তার আগে এই পদে ছিলেন সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী।
আগামী সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে আইরিন খানের দায়িত্ব গ্রহণকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন দায়িত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে দেশের অবস্থান জাতিসংঘে তুলে ধরতে হবে তাকে।
আইরিন খান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে পরিচিত একজন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ। মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শরণার্থী সুরক্ষা, আইনের শাসন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন তিনি।
২০২০ সাল থেকে তিনি জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মতামতের অধিকারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই দায়িত্বে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করেছেন তিনি।
এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন সংস্থাটির প্রথম নারী মহাসচিব।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর দিয়ে আইরিন খানের আন্তর্জাতিক কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। সেখানে প্রায় ২১ বছর কাজ করেন তিনি এবং সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করেন।
ভারতেও ইউএনএইচসিআরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। শরণার্থী সুরক্ষা ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন আইরিন খান। মানবাধিকার ও জেন্ডার সমতা থেকে শুরু করে টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
আইরিন খান আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তিনি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড ল স্কুলে পড়াশোনা করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তিনি জেনেভার গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে শিক্ষকতাও করেছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও উন্নয়ন বিষয়ে তার একাডেমিক ও পেশাগত অভিজ্ঞতা রয়েছে।
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে আইরিন খানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), এলডিসি থেকে উত্তরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, অভিবাসন ও মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে তার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।
দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। সম্প্রতি এসডিজি বাস্তবায়ন এবং এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের আরও সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
আইরিন খানের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সামনে আসছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন অধিবেশন। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কূটনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে হবে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা, উন্নয়ন অর্থায়ন, এসডিজি বাস্তবায়ন এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জসহ বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে জাতিসংঘে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে তার সামনে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আইরিন খানের প্রধান দায়িত্ব হবে জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা এবং দেশের কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা।
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করাও তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আরও পড়ুন:







