বাংলাদেশের গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হয়ে যাওয়া দুটি বিপন্ন প্রজাতির রিং-টেইলড লেমুরের সন্ধান মিলেছে ভারতে। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, লেমুর দুটি ভারতের গুজরাটে অবস্থিত ভান্তারা (Vantara) নামের বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণকেন্দ্রে রয়েছে।
লেমুর দুটি উদ্ধারে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়েছে। তবে প্রাণীগুলোর পরিচয় ও মালিকানা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় মাইক্রোচিপ, স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর কিংবা সংরক্ষিত ডিএনএ প্রোফাইল না থাকায় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সিআইডির তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ ভোরে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে তিনটি লেমুর চুরি করা হয়। এর মধ্যে দুটি লেমুরকে পরে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়।
তদন্তকারীরা জানান, বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্রের সদস্য জুয়েল নামে এক ব্যক্তি সাফারি পার্কের আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মী নিপ্পন মাহমুদের সহযোগিতায় লেমুরগুলো চুরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে প্রাণীগুলো বস্তায় ভরে একটি বাড়িতে রাখা হয়। সেখানে লেমুরগুলোর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয়।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কলকাতার বাবলু ও মুম্বাইয়ের শিপলু নামে দুই ব্যক্তি ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বাংলাদেশে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও লেনদেনের ব্যবস্থা করেন ডেলোয়ার ও তপন নামে আরও কয়েকজন।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পূর্ণবয়স্ক লেমুর ও একটি শাবকের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৭ লাখ টাকা। আর অন্য একটি শাবকের দাম ধরা হয়েছিল ৩ লাখ টাকা।
আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে সিআইডি জানিয়েছে, স্থানীয় এক সীমান্ত লাইনম্যানের সহযোগিতায় দুটি লেমুরকে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে নেওয়া হয়। পরে কয়েক হাত ঘুরে প্রাণী দুটি গুজরাটের জামনগরে পৌঁছায়।
সেখান থেকে ভারতীয় ক্রেতাদের মাধ্যমে লেমুর দুটি প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে ভান্তারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
লেমুর দুটি ভারতে রয়েছে—এমন তথ্য বাংলাদেশি তদন্তকারীদের নজরে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু ছবির মাধ্যমে।
ভান্তারায় থাকা লেমুরগুলোর ছবির সঙ্গে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি যাওয়া লেমুরের ছবি মিলিয়ে দেখার পর তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়। এরপর প্রাণী দুটি দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ শুরু করে বাংলাদেশ।
তবে শুধু ছবি দেখে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাণীর মালিকানা ও পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন। এ কারণে এখন ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
লেমুর দুটি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় গাজীপুর সাফারি পার্কে থাকার পরও তাদের শরীরে মাইক্রোচিপ বসানো হয়নি। প্রাণীগুলোর স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ নম্বরও ছিল না। একইভাবে তাদের ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষণ করা হয়নি।
ফলে গুজরাটে পাওয়া দুটি লেমুরই গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি যাওয়া প্রাণী—এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণের ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি হয়েছে।
তদন্তকারীরা এখন বাংলাদেশে থাকা তৃতীয় লেমুরটির ডিএনএ প্রোফাইল তৈরির চেষ্টা করছেন। ওই প্রাণীটির সঙ্গে ভারতে থাকা দুটি লেমুরের রক্তের সম্পর্ক প্রমাণ করা গেলে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা সহজ হবে।
লেমুর চুরির ঘটনায় মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। তাদের মধ্যে ছয়জন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
অন্যদিকে ডেলোয়ার ও জাহির মিয়া নামের দুই আসামির জবানবন্দি নেওয়া সম্ভব হয়নি। গ্রেপ্তারের পর জামিনে গিয়ে তারা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
সিআইডির তদন্তে বন্যপ্রাণী পাচারের একটি আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, লেমুরগুলোর মূল ইতিহাসও ছিল অস্বাভাবিক। ২০১৮ সালের আগস্টে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিরল পাখি ও প্রাণীর একটি অবৈধ চালান জব্দ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সেই চালানের মধ্যে এক জোড়া লেমুরও ছিল।
তদন্তকারীদের মতে, লেমুরগুলোকে পাখি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে জব্দ করা প্রাণীগুলোর একটি অংশ গাজীপুর সাফারি পার্কে রাখা হয়।
সাফারি পার্কে থাকা অবস্থায় লেমুর জোড়াটির দুটি শাবক জন্ম নেয়। পরে পুরুষ লেমুরটি মারা গেলে স্ত্রী লেমুর ও দুটি শাবক সেখানে ছিল। ২০২৫ সালের মার্চে ওই তিনটির মধ্যে দুটি শাবকসহ লেমুর চুরি হয়ে যায়।
রিং-টেইলড লেমুরের বৈজ্ঞানিক নাম Lemur catta। এ প্রাণীর আদি আবাস আফ্রিকার মাদাগাস্কার। কালো-সাদা বলয়ের মতো লেজের কারণে প্রাণীটি সহজেই শনাক্ত করা যায়।
আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সিআইটিইএসের তালিকায় রিং-টেইলড লেমুর Appendix I-এর অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রাণীর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
আরও পড়ুন:







