র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র্যাবের অধ্যায় শেষ করে পুলিশের অধীনে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনের পথ চূড়ান্ত হলো। বিরোধী দলের আপত্তি ও নোট অব ডিসেন্টের মধ্যেই জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিলটি পাস হয়।
এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। পরে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। ৮ সেপ্টেম্বর কমিটি প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে বিলটি সংসদে উপস্থাপনের সুপারিশ করে।
নতুন আইনে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় দ্রুত ও বিশেষায়িত সক্ষমতা নিশ্চিত করাই ইউনিটটির অন্যতম লক্ষ্য।
এসআরবির দায়িত্বের মধ্যে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি গুম, ভূমিদস্যুতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার ও অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
আইনে এসআরবিকে নির্দিষ্ট আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি চালানো, মালামাল বা আলামত জব্দ এবং গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তার করা ব্যক্তি কিংবা জব্দ করা আলামত এসআরবির কাছে রাখার সুযোগ থাকছে না। এসব নিকটস্থ থানার হেফাজতে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
র্যাব বিলুপ্ত হলেও এর বিদ্যমান জনবল, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ অর্থ ও ব্যাংক আমানত, দায়-দেনা, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার, নথিপত্র ও অন্যান্য সম্পদ এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, র্যাবের নাম ও বিদ্যমান আইনি কাঠামো বিলুপ্ত হলেও বাহিনীটির জনবল ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর একটি বড় অংশ নতুন ইউনিটের কাজে ব্যবহৃত হবে। সংসদীয় কমিটিও দক্ষ জনবল ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো আধুনিক ব্যবস্থায় কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, এসআরবি পুলিশের অধীনেই পরিচালিত হবে। ইউনিটটির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কর্মরত একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যার পদমর্যাদা অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের নিচে হবে না।
সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে সদস্য ও কর্মকর্তাদের পদায়ন বা প্রেষণের মাধ্যমে এসআরবি গঠন করা হবে। ইউনিটটির জন্য পৃথক পতাকা, প্রতীক ও নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম থাকার বিধানও রাখা হয়েছে।
এসআরবির সদস্যদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগ এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
কমিটিতে এসআরবির কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিনিধি, বিচার বিভাগের একজন কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তিকে রাখার বিধান রয়েছে। তবে কমিটির নেতৃত্ব ও স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধী সদস্যরা প্রশ্ন তুলেছেন।
এসআরবি সদস্যদের জন্য গুরু ও লঘু—দুই ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গুরুদণ্ডের মধ্যে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত এবং বেতন-ভাতা বা জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্তের মতো শাস্তি রয়েছে।
লঘুদণ্ডের মধ্যে জরিমানা, তিরস্কার, কোয়ার্টার গার্ডে আটক ও অতিরিক্ত ড্রিলের বিধান রাখা হয়েছে। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো সদস্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।
বিলটি নিয়ে শুরু থেকেই বিরোধী দলের আপত্তি ছিল। বিরোধীদলীয় নেতারা র্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে সমর্থন জানালেও নতুন নামে একই ধরনের বাহিনী গঠনের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বিরোধী দলের বক্তব্য, র্যাবের জনবল, সম্পদ ও কার্যক্রমের বড় অংশ এসআরবিতে চলে গেলে সাধারণ মানুষের কাছে এটি নতুন নামে র্যাব পুনর্গঠনের মতো মনে হতে পারে। তারা নতুন বাহিনী গঠনের আগে আরও বিস্তৃত জাতীয় পরামর্শ, স্বাধীন নজরদারি ও শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, র্যাব নামে কোনো সংস্থা থাকবে না—এটি ছিল সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। একই সঙ্গে দেশের জননিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, নতুন এসআরবিতে র্যাবের তুলনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও তদারকির ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, র্যাবের বিতর্কিত অতীতের কারণে দক্ষ জনবল ও বিপুল রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো পুরোপুরি পরিত্যাগ না করে নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে ব্যবহার করা হবে।
আরও পড়ুন:







