কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রাশিয়া থেকে আসা পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরের দিকে ইউরেনিয়ামবাহী তিনটি বিশেষ লরির বহর পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে।
এর আগে শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত ১১টা ৪৪ মিনিটের দিকে রাশিয়া থেকে বিশেষ কার্গো বিমানে করে ইউরেনিয়ামের চালান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ও নিরাপত্তা যাচাই শেষে শনিবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় সড়কপথে চালানটি রূপপুরের উদ্দেশে পাঠানো হয়।
ইউরেনিয়াম পরিবহনে তিনটি বিশেষ লরি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো যাত্রাপথে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা থেকে রূপপুর পর্যন্ত দুই শতাধিক কিলোমিটার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইউরেনিয়ামবাহী বহরের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে মহাসড়কের একটি লেন খালি রাখা হয়েছিল। বহরটি যমুনা সেতু অতিক্রম করে পাবনার দিকে এগিয়ে যায়।
পাবনার ঈশ্বরদী এলাকায় পৌঁছানোর পর প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চালানটি গ্রহণ করেন। কড়া নিরাপত্তার কারণে পুরো পরিবহন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়।
সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই চালানকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য আসা প্রথম ইউরেনিয়াম চালান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত জ্বালানি ও দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিংয়ের প্রয়োজনীয় জ্বালানি পর্যায়ক্রমে দেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যে আরও নয়টি ফ্লাইটে মোট ২১১টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি দেশে আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ইউনিটের রিফুয়েলিংয়ের জন্য ৪৮টি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি অ্যাসেম্বলি থাকবে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটমের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে এসব জ্বালানি বাংলাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে।
ইউরেনিয়ামের এবারের চালানটি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় বিলম্বে বাংলাদেশে এসেছে। এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর চালানটি দেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু উড়োজাহাজের নির্ধারিত রুটে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় সেই সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়। পরে নতুন সময়সূচি অনুযায়ী শুক্রবার রাতে বিশেষ কার্গো বিমানটি ঢাকায় পৌঁছায়।
রাশিয়ায় তৈরি ইলিউশিন-৭৬ মডেলের বিশেষ কার্গো বিমানে করে পারমাণবিক জ্বালানি বাংলাদেশে আনা হয়। বিমানটি ঢাকায় অবতরণের পর নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করে জ্বালানি খালাস করা হয়।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে।
প্রথম ইউনিটের জ্বালানি ইতোমধ্যে প্রকল্পে আনা হয়েছে এবং জ্বালানি লোডিংয়ের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এখন কমিশনিংয়ের বিভিন্ন ধাপ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ ও কমিশনিং-সংক্রান্ত কাজও চলমান রয়েছে।
পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রূপপুর পর্যন্ত সড়কপথে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়।
জ্বালানি পরিবহনের সময় যানজট এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। চালানটি নিরাপদে রূপপুরে পৌঁছানোর পর সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
রূপপুরে ইউরেনিয়ামের নতুন চালান পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রম আরও এক ধাপ এগোল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও কয়েক দফায় প্রয়োজনীয় ফুয়েল অ্যাসেম্বলি দেশে আসার কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন:







