সর্বশেষ
ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক স্থাপত্য শিক্ষা সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জনাব মাহ্দী আমিনের বক্তব্য:
আমরা এমন এক সময়ে এখানে এসেছি, যখন আমাদের নবনির্বাচিত সরকারের বয়স মাত্র আট মাস। আমরা জানি কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে আমরা প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে দেখি সমস্যা সমাধানের একটি অনন্য সুযোগ হিসেবে। আমাদের উদ্দেশ্য নিশ্চিত করা যেন বাংলাদেশের স্থপতিরা দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁদের মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেন ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন।
স্থাপত্য একটি বিশেষায়িত পেশা। এটি সৃষ্টিশীল, এটি উদ্ভাবনী এবং সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমরা যেখানেই যাই, যেখানেই খাওয়া দাওয়া করি কিংবা কাজ করি, এই নান্দনিক ভবন বা আধুনিক মিলনায়তনের মতোই স্থাপত্য আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে আছে।
এর অর্থ হলো, স্থাপত্য বিভিন্ন মাত্রাকে ধারণ করে। এটি সময়ের সারমর্মকে ধারণ করে, ধারণ করে আমাদের ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে এবং একই সাথে এটি বৈশ্বিক সেরা চর্চাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। পৃথিবী বদলাচ্ছে, স্থাপত্যের দৃশ্যপটও পরিবর্তিত হচ্ছে; কিন্তু একই সাথে তা দেশের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রাখছে।
আমাদের দেশে অসাধারণ সব স্থপতি ও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এখন সরকারের দায়িত্ব হলো এমন একটি উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেওয়া, যাতে তাঁরা তাঁদের পেশাগত জীবনে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন।
আমি জানতে পেরেছি, প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার গ্র্যাজুয়েট স্থপতি হিসেবে বের হচ্ছেন। সরকার হিসেবে আমাদের দায়িত্ব এই চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করা। এই তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের জন্য যেন পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় কিংবা উচ্চতর মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য বিদেশে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আজকের এই আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে আমাদের শুধু দেশের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমরা চাই আমাদের স্থপতিরা দেশেই ডিগ্রি নেবেন, দেশেই শিক্ষা লাভ করবেন, কিন্তু তাঁদের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে বসেই বিদেশের বিভিন্ন বড় বড় নকশা ও স্থাপত্যের কাজ করবেন।
সেটি করতে হলে আমাদের প্রয়োজন আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতি। মেধা সমস্যা নয়, সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির উপযুক্ত পথরেখা তৈরি করা। আইএবি যদি অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে, তবে আমাদের স্থপতিরা বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারবেন। আজকের অনুষ্ঠানে 'ক্যানবেরা অ্যাকর্ড'-এর উপস্থিতিকে আমি সাধুবাদ জানাই। আমরা যদি সবাই একসাথে কাজ করি, তবে এমন একটি অবস্থা তৈরি হবে যেখানে বাংলাদেশের স্থাপত্যের ডিগ্রিগুলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে। এ জন্য যা যা করণীয়, আইএবি, ইউজিসি ও বিএসিকে একসাথে কাজ করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি।
সরকারের পক্ষ থেকে স্থাপত্য শিক্ষার প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাদান পদ্ধতি আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কীভাবে পাঠ্যক্রমকে আরও আধুনিক ও বাস্তবমুখী করা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সঠিক মানের লাইব্রেরি, বই, স্টুডিও, স্থাপত্য সরঞ্জাম রয়েছে কি না, শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে কি না, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত সঠিক আছে কি না এবং ইন্ডাস্ট্রির সাথে প্রয়োজনীয় সংযোগ রয়েছে কি না, তা মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব সহযোগিতা দিতে আমরা সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেব। তা অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগই হোক কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য শিক্ষার জন্য অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দই হোক, সেই সুবিধা দিতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।
আমরা স্থাপত্য শিক্ষাকে এবং স্থপতিদের পেশাকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদায় মূল্যায়ন করি। আমাদের মেধাবী স্থপতিরা যেন বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াতে পারেন, সেজন্য যা যা সহায়তা প্রয়োজন আমরা তা করব। আমাদের বহু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে যারা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন। আমরা চাই বর্তমান প্রজন্মের স্থপতিরাও সেই সাফল্য বয়ে আনুক।
আপনারা প্রতিটি যে ভবন তৈরি করেন, প্রতিটি যে স্থাপত্যের রূপ দেন, তা কেবল বর্তমানের জন্য নয়; তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি বার্তা বহন করে এবং আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে এক সেতুবন্ধন রচনা করে। তাই আমি স্থপতিদের আহ্বান জানাব, আধুনিকতা ও বৈশ্বিক মানদণ্ডকে গ্রহণ করার পাশাপাশি আমাদের শেকড় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। লন্ডন বা নিউইয়র্কের মতো বিশ্বখ্যাত শহরগুলোর কথা উঠলেই যেমন আইকনিক ভবনগুলোর কথা মনে পড়ে, তেমনি আমাদের স্থপতিদেরও সেই সক্ষমতা রয়েছে ঢাকা তথা পুরো বাংলাদেশের জন্য সেরকম আইকনিক স্থাপনা গড়ে তোলার।
আমাদের দেশে প্রায় ৭ হাজার গ্র্যাজুয়েট রয়েছেন, স্থপতিদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পথ সুগম করতে চায় সরকার। আমাদের তরুণ পেশাজীবীদের মেধা যেন ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক প্রকল্পে ভূমিকা রাখতে পারে, সেই লক্ষ্যে একটি আধুনিক ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ রূপরেখা গড়ে তোলা দরকার। একই সাথে স্থাপত্যে মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা জরুরি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার হিসেবে আমরা যেসব নীতি গ্রহণ করছি, তার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে দেশের সামগ্রিক স্থাপত্য ও অবকাঠামোগত দৃশ্যপটে বড় রূপান্তর আসবে। আমরা চাই আমাদের স্থপতি বন্ধুরা তাঁদের মেধা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়ে আসুন এবং এমন স্থাপত্য উপহার দিন যা এই নতুন সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নতুন পরিচয় তুলে ধরবে।
সরকারি খাত প্রয়োজনীয় সহায়ক নীতিমালা দেবে এবং বেসরকারি খাতকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করবে। আমাদের স্থপতিদের পেশাগত দক্ষতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। সরকারের কার্যকর সহযোগিতার মাধ্যমে তাঁরা দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে অনন্য সাফল্য বয়ে আনবেন। বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকাকে সমুন্নত রাখতে আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন নিশ্চিত করতে আইএবি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় সরকারের সর্বোচ্চ সমর্থন থাকবে।
আরও পড়ুন:







