News Ticker
221.png

দেশকে ‘গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ বানাতে জাপানের বিনিয়োগ চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:০৫

আপডেট: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:২৮

শেয়ার

শেয়ার

দেশকে ‘গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ বানাতে জাপানের বিনিয়োগ চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে জাপানি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ জন্য জ্বালানি, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, উড়ালসড়ক ও দ্রুতগতির রেল যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের টোকিওতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) হলে ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগ’-এ মূল বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এখন অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সময় এসেছে।
২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার প্রত্যাশা —
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ১৮ কোটির বেশি মানুষের বিশাল বাজার রয়েছে। জনসংখ্যার গড় বয়স ২৭ বছর। এ ছাড়া প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার শিক্ষার্থী প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তরুণ ও প্রশিক্ষণযোগ্য জনশক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের ধারাবাহিকতায় ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখন এই সম্পর্ককে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।
৭ হাজার ৩৭৯ বাংলাদেশি পণ্য জাপানে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ —
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক জোরদার করতে চলতি বছর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এ ধরনের প্রথম চুক্তি এটি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে। একইভাবে ইস্পাত, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে।
এ ছাড়া বিনিয়োগ, সেবা ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সমাধানে কাজ করছে সরকার —
জাপানি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হলো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, কার্যকর অবকাঠামো এবং পূর্বানুমানযোগ্য শুল্ক ও করব্যবস্থা।
তিনি বলেন, সরকার ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। জাপানি কোম্পানিগুলোর উদ্বেগের বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এরই মধ্যে কিছু সমস্যার সমাধান করা হয়েছে এবং বাকি বিষয়গুলো সমাধানে কাজ চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই সরকারের দায়িত্ব।
আরাইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আহ্বান —
বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করলে জাপানি বিনিয়োগকারীরা বড় ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাবেন।
তিনি জানান, জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, বড় খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষিযন্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন কোম্পানি আরাইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।
ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোকে বিশেষভাবে তিনটি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান —
প্রথম খাত হিসেবে জ্বালানির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অপরিহার্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং অত্যাবশ্যক।
তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা পূরণে জাপানি কোম্পানিগুলোকে কাজ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে জাপানের বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করেন।
প্রযুক্তি পার্ক ও মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতা —
দ্বিতীয় খাত হিসেবে প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি জানান, বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে একটি উদ্ভাবননির্ভর তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ উদ্যোগে জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
এ ছাড়া মহাকাশ প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও মহাকাশবিজ্ঞানে জাপানের উন্নত সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে এ খাতে দুই দেশের পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের মহাকাশ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
দেশজুড়ে উড়ালসড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা —
তৃতীয় খাত হিসেবে উড়ালসড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের শহর ও গ্রাম, কারখানা ও বন্দরের মধ্যে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা উৎপাদনশীল অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য পরিবহন আরও কার্যকর করতে চায় সরকার।
এ লক্ষ্যে দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়ালসড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এ নেটওয়ার্কের জন্য একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে জাপানের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ ও অর্থায়নের আহ্বান জানান তিনি।
জাপানি ভাষা শেখানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বাংলাদেশ —
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে যান এবং সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দেশে ফিরে তারা জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি তরুণ জাপানি ভাষায় দক্ষ হয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করতে ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার আহ্বান —
বক্তব্যের শেষাংশে জাপানি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান পাশে ছিল। এখন বাংলাদেশের শিল্প খাত গড়ে তোলা, নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং দেশের সঙ্গে যৌথভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য জাপানি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তর করে দুই দেশের জনগণ ও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ এবং উভয় দেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকাসহ দুই দেশের ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন:

ChannelNRB Footer