জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
ওবায়দুল কাদের ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ছয় আসামি হলেন—
-
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম
-
সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত
-
যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ
-
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল
-
ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন
-
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান
মামলার সাত আসামিই পলাতক অবস্থায় রয়েছেন বলে এর আগে আদালত ও রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছিল। তাদের অনুপস্থিতিতেই আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ছিল, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আসামিরা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে সমন্বিত ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালাতে নির্দেশনা, উসকানি ও প্ররোচনা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বৈঠকে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ আনা হয়।
এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা, প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ, কঠোর দমন-পীড়ন এবং আন্দোলনের সময় তথ্যপ্রবাহ ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের সঙ্গে আসামিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও মামলায় তুলে ধরে প্রসিকিউশন।
মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ বিভিন্ন অডিও-ভিডিও, নথি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে। এর মধ্যে আন্দোলনের সময় ওবায়দুল কাদেরের বিভিন্ন ফোনালাপও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, একটি ফোনালাপে তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনানকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।
আরেকটি ফোনালাপে ইন্টারনেটের গতি কমানোর বিষয়ে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের কথোপকথন আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এসব তথ্যকে আন্দোলন দমনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে দেখায় রাষ্ট্রপক্ষ।
মামলার বিচারিক কার্যক্রমে তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। একই সঙ্গে আদালতে ১২৩ সিরিজের ডকুমেন্টারি প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।
২০২৬ সালের ২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর ৪ আগস্ট থেকে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। কয়েক দফা শুনানি শেষে ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলাটির তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৮ জুন। তদন্ত শেষে ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। পরে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল ও আমলে নেওয়া হয়।
এরপর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, আসামিদের পলাতক ঘোষণা এবং রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগের পর ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২।
১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্য ও প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্কে দাবি করে, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সাক্ষ্য ও নথিপত্রের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। প্রসিকিউশন তাদের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আবেদন করে।
রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য ছিল, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের পর্যায় থেকে আন্দোলন দমনে সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা ও উসকানির মাধ্যমে যে সহিংসতা সংঘটিত হয়েছিল, তার দায় সংশ্লিষ্ট আসামিদের ওপর বর্তায়।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাত আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
আরও পড়ুন:







