অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা ওভালে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো তাদেরই মাটিতে টেস্ট জয়ের স্বাদ পেল টাইগাররা।
এই জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম বড় অর্জন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট জয়; এর আগে ২০১৭ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটাই প্রথম জয়।
টসের পর ম্যাচের শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ তৈরি করে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ। স্বাগতিকরা প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে যায়। বাংলাদেশের পেস আক্রমণ ও নিয়ন্ত্রিত বোলিং অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে বড় স্কোর গড়তে দেয়নি।
জবাবে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে বাংলাদেশ। তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে শতক করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। তাঁর ইনিংসের ওপর ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান সংগ্রহ করে এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পায় ২২৮ রানের বিশাল লিড।
তানজিদের পাশাপাশি অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসও বাংলাদেশের বড় সংগ্রহ গড়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে অস্ট্রেলিয়া। ক্যামেরন গ্রিন লড়াই করে ১০৪ রান করেন। কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নিয়ে স্বাগতিকদের বড় লিড নেওয়ার সুযোগ দেননি।
শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তিনি ৫ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি স্পিনারও হলেন মিরাজ।
তবে পুরো ম্যাচে বাংলাদেশের সেরা বোলার ছিলেন হাসান মাহমুদ। দুই ইনিংস মিলিয়ে তিনি নেন মোট ৯ উইকেট এবং তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচসেরার পুরস্কারও পান।
৫৭ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ শুরুতে একটি উইকেট হারালেও কোনো বিপদ হতে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৪.২ ওভারে এক উইকেট হারিয়ে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় টাইগাররা।
৯ উইকেটের এই জয় শুধু স্কোরবোর্ডের জয় নয়—এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের মানসিকতায় বড় পরিবর্তনের প্রতীক। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের ঘরের মাঠে এমন নিয়ন্ত্রিত ও দাপুটে পারফরম্যান্স বাংলাদেশের টেস্ট দলের সাম্প্রতিক উন্নতিরই প্রমাণ।
বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফরের এই টেস্টটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলছে বাংলাদেশ। ২০০৩ সালের সফরের পর দুই দলের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আর টেস্ট হয়নি।
সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফিরে এসেই বাংলাদেশের এমন জয় ক্রিকেটবিশ্বে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ সব দিক থেকেই অস্ট্রেলিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে।
ডারউইন টেস্ট জিতে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। অর্থাৎ দ্বিতীয় টেস্টে জয় বা ড্র করতে পারলেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়ের ইতিহাসও গড়বে টাইগাররা। দ্বিতীয় টেস্ট অনুষ্ঠিত হবে ম্যাকেতে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এই জয় তাই কেবল একটি টেস্ট ম্যাচের ফল নয়; এটি দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ২০১৭ সালে ঢাকায় অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর এবার তাদের ঘরের মাঠে জয়—বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের অগ্রযাত্রায় নিঃসন্দেহে আরেকটি স্মরণীয় মাইলফলক।
সূত্র: এপি নিউজ
আরও পড়ুন:







